ইসলামের ইতিহাসে হিজরত এক মহান মোড়। সেদিন নবীজি (সা.) শুধু মক্কা ছেড়ে মদিনার পথে যাত্রা করেননি; জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আল্লাহর দ্বীনকে নতুন ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর পথে হেঁটেছিলেন। সেই কঠিনতম পথে তার সঙ্গী নির্বাচিত হয়েছিলেন আবু বকর সিদ্দিক (রা.)।
কোরআন তার সেই মর্যাদা স্মরণ করিয়ে বলেছে, ‘যখন তারা দুজন গুহায় ছিলেন, তখন তিনি তার সঙ্গীকে বলছিলেন, চিন্তা করো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা তাওবা, আয়াত: ৪০)। এখানে ‘সঙ্গী’ বলতে আবু বকর (রা.)-কেই বোঝানো হয়েছে। মুফাসসিরগণ বলেছেন, ‘সানিয়া ইসনাইন’ অর্থাৎ ‘দুজনের দ্বিতীয়জন’ বলতে সাওর পাহাড়ের গুহায় নবীজির (সা.) সঙ্গী আবু বকর (রা.)-কে বোঝানো হয়েছে। (তাফসির ইবনে কাসির, সুরা তাওবা: ৪০)
আবু বকর (রা.) ছিলেন নবীজির (সা.) প্রিয়তম সাহাবি এবং প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের মধ্যে ইসলামের প্রথম স্বীকারকারী। নবুওয়াতের শুরুর দিনগুলোতে যখন ইসলাম অত্যন্ত দুর্বল ছিল, তখনই তিনি নির্ভয়ে ঈমান আনেন এবং নবীজির পাশে দাঁড়ান। তার ঈমান শুধু বিশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি নিজের সম্পদ, সময়, সম্মান এবং জীবন সবকিছু ইসলামের পথে উৎসর্গ করেছিলেন। তাই হিজরতের মতো এক আত্মত্যাগের সফরে নবীজির (সা.) সঙ্গী হওয়ার যোগ্যতা সবচেয়ে বেশি তারই ছিল।
নবীজি (সা.) যখন তার বাড়িতে গিয়ে বললেন, ‘আল্লাহ আমাকে বের হওয়ার অনুমতি দিয়েছেন,’ তখন আবু বকর (রা.) বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল, আপনার সঙ্গী কে হবেন?’ নবীজি বললেন, ‘তুমি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৯০৬)। এই সংক্ষিপ্ত উত্তরেই লুকিয়ে আছে এক বিরাট সম্মান। নবীজি (সা.) তার সবচেয়ে বিপজ্জনক সফরের সঙ্গী হিসেবে বেছে নিলেন সেই ব্যক্তিকে, যার আমানত, সাহস ও একনিষ্ঠতার ওপর তিনি পূর্ণ ভরসা করতেন।
হিজরতের রাতে নবীজি (সা.) ও আবু বকর (রা.) মক্কার দক্ষিণে সাওর পাহাড়ের একটি গুহায় আশ্রয় নেন। উদ্দেশ্য ছিল, কুরাইশদের অনুসন্ধানী দল যেন মদিনার উত্তর দিকে খুঁজে ব্যর্থ হয়। কুরাইশরা প্রতিটি পথে পাহারা দিয়েছিল। তারা ঘোড়া ও দ্রুতগামী উটে নবীজিকে (সা.) খুঁজছিল। অথচ আল্লাহর ইচ্ছায় তারা দুজন তিন রাত গুহায় অবস্থান করেন এবং শত্রুর চোখ এড়িয়ে যান। (সিরাতে ইবনে হিশাম; সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৬৫৩)
একদিন কুরাইশ অনুসন্ধানী দল গুহার মুখ পর্যন্ত এসে পৌঁছায়। আবু বকর (রা.) ভয়ে বললেন, ‘তাদের কেউ যদি নিচের দিকে তাকায়, আমাদের দেখে ফেলবে।’ নবীজি (সা.) বললেন, ‘হে আবু বকর, তুমি কী মনে করো, যে দুজনের তৃতীয়জন আল্লাহ?’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৬৫৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৩৮১)। এই কথাটি ছিল ঈমানের সবচেয়ে গভীর ঘোষণা। মানুষের সব শক্তি, ষড়যন্ত্র ও হুমকির ওপরে ছিল আল্লাহর সাহায্য।
হিজরতের পথে নবীজির (সা.) সঙ্গী হবেন, এ কথা জানার পর আবু বকর (রা.) হিজরতের জন্য দুটি উট প্রস্তুত রেখেছিলেন, পথের ব্যবস্থা করেছিলেন এবং নবীজির (সা.) নিরাপত্তার জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। তিনি জানতেন, ধরা পড়লে প্রথমে তাকেই শাস্তি দেওয়া হবে। তবু তিনি এক মুহূর্তের জন্যও পিছিয়ে আসেননি। কারণ তার কাছে নবীজির (সা.) সঙ্গ ছিল জীবনের সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য। এখানেই প্রকৃত বন্ধুত্বের সংজ্ঞা খুঁজে পাওয়া যায়। সুখের দিনে সবাই সঙ্গী হতে পারে; কিন্তু বিপদের রাতে যে ব্যক্তি পাশে থাকে, তিনিই প্রকৃত সঙ্গী। আবু বকর (রা.) সেই পরীক্ষায় পাশ করে ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন।
এই ঘটনা আমাদের শেখায়, ঈমানের আসল পরীক্ষা বিপদ ও ভয়ের মুহূর্তে হয়। যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা রাখে, তার জন্য শত্রুর সব ষড়যন্ত্রই শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়। আবু বকর (রা.) গুহায় গিয়েছিলেন কারণ তিনি ছিলেন নবীজির (সা.) প্রতি পূর্ণ আস্থাশীল, ইসলামের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ এবং আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাসী। তার সেই সঙ্গই তাকে ইতিহাসে ‘সিদ্দিক’ উপাধিধারী মহান সাহাবি হিসেবে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে।
ইফতেখারুল হক হাসনাইন : আলেম ও প্রাবন্ধিক
পাঠকের মতামত 0
শালীন ও গঠনমূলক মন্তব্য কাম্যআপনার মন্তব্য লিখুন
আপনার ইমেইল ঠিকানাটি গোপন রাখা হবে। তারকা চিহ্নিত (*) ঘরগুলো পূরণ করা বাধ্যতামূলক।