বাংলা লাইভ নিউজ ডেস্ক: শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান (১৯৩৬-১৯৮১) বীরউত্তম ছিলেন একজন জননন্দিত রাষ্ট্রনায়ক। যাঁর নির্ভীকতা, দৃঢ়চেতা মনোভাব, দায়িত্ববোধ, পরিশ্রমী স্বভাব, সততা, আদর্শবাদ, সৃষ্টিশীলতা ও দূরদর্শিতা তাঁকে সকলের প্রিয় ও আস্থাভাজন করে তুলেছিল।
- •শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান (১৯৩৬-১৯৮১) বীরউত্তম ছিলেন একজন জননন্দিত রাষ্ট্রনায়ক।
- •যাঁর নির্ভীকতা, দৃঢ়চেতা মনোভাব, দায়িত্ববোধ, পরিশ্রমী স্বভাব, সততা, আদর্শবাদ, সৃষ্টিশীলতা ও দূরদর্শিতা তাঁকে সকলের প্রিয় ও আস্থাভাজন করে তুলেছিল।
- •মাতৃভূমির দুঃসময়ে সমস্যা ও ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় তিনি ছিলেন স্তম্ভপ্রতীম ব্যক্তিত্ব।
মাতৃভূমির দুঃসময়ে সমস্যা ও ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় তিনি ছিলেন স্তম্ভপ্রতীম ব্যক্তিত্ব। তাঁর এই সাহস, দৃঢ়তা ও প্রজ্ঞা তিনি অর্জন করেছিলেন অপার দেশপ্রেম এবং দায়িত্ব পালনের অটল নিষ্ঠা থেকে। তিনি জনগণকে গভীরভাবে ভালোবেসে তাদের কল্যাণে আন্তরিকভাবে কাজ করতেন বলেই জনগণও অন্তর দিয়ে তাঁকে ভালোবেসেছে, সানন্দে তাঁর আদেশ, অনুরোধ ও পরামর্শ গ্রহণ করেছে।
কৃষি ও কৃষকবান্ধব জিয়া সবুজ বিপ্লবের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে আমূল পরিবর্তন এনেছিলেন। জিয়াউর রহমানের গৃহীত বিভিন্ন পরিকল্পনা ও কর্মসূচি দেশের কৃষি উন্নয়ন তথা অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করেছে। বাংলাদেশের ইতিহাসের এক ক্রান্তিলগ্নে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। জিয়াউর রহমান দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, বাংলাদেশের প্রকৃত মুক্তি নিহিত রয়েছে কৃষকের সমৃদ্ধিতে। তাঁর কাছে মানবতাবাদ মানে কেবল তাত্ত্বিক আলোচনা ছিল না, তা ছিল কৃষকের মুখে অন্ন তুলে দেওয়া এবং তাদের সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা। ‘গ্রাম বাঁচলে দেশ বাঁচবে’ এই কালজয়ী স্লোগানকে সামনে রেখে তিনি সচিবালয় থেকে বেরিয়ে কৃষকের পলিমাখা মাঠকে তাঁর কর্মক্ষেত্র বানিয়েছিলেন। কৃষকদের প্রতি তাঁর এই অকৃত্রিম দরদ ও মাটির কাছাকাছি যাওয়ার মানসিকতা তাঁকে কেবল একজন রাষ্ট্রনায়ক নয়, সাধারণ মানুষের একজন আপনজনে পরিণত করেছিল। মূলত কৃষিনির্ভর এই জনপদে তিনি যে ‘সবুজ বিপ্লব’ এবং‘খাল খনন কর্মসূচি’র সূচনা করেছিলেন, তা ছিল তাঁর গভীর দেশপ্রেম ও মানবিক সমাজ গঠনের এক অনন্য প্রতিফলন। জিয়াউর রহমান বিশ্বাস করতেন, এদেশের কোটি কোটি মানুষের ভাগ্য উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন এদেশের কৃষকের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে। কৃষকের ভাগ্যের এই পরিবর্তন তিনি ড্রয়িংরুমে বসে পরিকল্পনা করেননি, তিনি কোদাল হাতে কৃষকের সঙ্গে মিছিলে শামিল হয়ে প্রমাণ করেছিলেন যে, শ্রমের মর্যাদা কী। তাঁর প্রবর্তিত ১৯ দফা কর্মসূচি এবং ‘গ্রাম বাঁচলে দেশ বাঁচবে’ স্লোগানটি ছিল মূলত কৃষিনির্ভর এই জনপদকে স্বাবলম্বী করার এক মানবিক ইশতেহার। কৃষকদের সেচ সুবিধা দেওয়ার জন্য খাল খনন, সার ও বীজ সহজলভ্য করা এবং গ্রাম সরকার ব্যবস্থার মাধ্যমে তিনি সাধারণ কৃষকদের রাষ্ট্রের মূলধারায় নিয়ে এসেছিলেন। মূলত তাঁর এই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও কৃষিবান্ধব নীতির মাধ্যমেই বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের স্বপ্ন দেখেছিল। স্বাধীনতার মহান ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়ন ও আধুনিকায়নে শক্ত ভীত রচনা করে গেছেন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে অভিষিক্ত হয়েই তিনি অগ্রাধিকার দিয়ে তাঁর গৃহীত পরিকল্পনা ও কর্মসূচিতে কৃষির আধুনিকায়ন ও উন্নয়নকে অন্তর্ভুক্ত করেন। তিনি গতানুগতিক রাজনৈতিক ধারা থেকে দেশকে উৎপাদন ও উন্নয়নের রাজনীতিতে নিয়ে আসেন। জিয়াউর রহমান যখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ ছিল তীব্র খাদ্য সংকট ও বিদেশের ওপর চরম পরনির্ভরশীলতায় জর্জরিত একটি দেশ। সেই সময় প্রতি বছর কয়েক লক্ষ টন খাদ্যশস্য বিদেশ থেকে আমদানি করতে হতো এবং সীমিত বৈদেশিক মুদ্রার এক বিরাট অংশ কেবল চাল-গম কিনতেই ব্যয় হয়ে যেত। এই পরনির্ভরতা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছিল। খাদ্যের জন্য এই পরনির্ভরশীলতা কেবল অর্থনৈতিক সংকটই ছিল না, এটি জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদার জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। জিয়াউর রহমান গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন যে, ত্রাণ বা বিদেশি সাহায্যের ওপর ভিত্তি করে একটি জাতি কখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না এবং ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র অপবাদ ঘোচাতে হলে কৃষিতে বিপ্লব ঘটানো ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই। এই লক্ষ্যেই তিনি পরনির্ভরশীলতার গ্লানি মুছে ফেলে দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে এবং সাধারণ কৃষকের মুখে অন্নের নিশ্চয়তা দিতে সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও খাল খনন কর্মসূচির মতো বৈপ্লবিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করা এবং কৃষিতে স্বনির্ভরতা অর্জন করা। তিনি নিজে কোদাল হাতে নিয়ে মাটি কেটে এই কাজের উদ্বোধন করেন, যা সাধারণ কৃষক ও যুবসমাজের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছিল। প্রেসিডেন্ট জিয়ার দূরদর্শী নেতৃত্বে দেড় বছরে সারা দেশে ১৫০০ এরও অধিক খাল খনন ও পুনঃখননের যে বৈপ্লবিক কর্মসূচি শুরু হয়েছিল, তা স্বল্প সময়ের মধ্যেই দেশকে খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিয়েছিল। একজন বিজ্ঞানীর মতো তিনি ভ‚গর্ভস্থ পানির সঠিক ব্যবহার নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতেন, যার মূল লক্ষ্য ছিল ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহার করে সেচের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি এবং ভূগর্ভস্থ পানির উপর নির্ভরতা কমানো। এই দূরদর্শিতার অভাব আজ প্রকটভাবে দৃশ্যমান, যেখানে বর্তমানে কৃষি সেচের ৮১% এরও বেশি পানি ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে আসে এবং মাত্র ১৯% নদীনালা, খাল-বিল ও বৃষ্টির পানি থেকে সংগৃহীত হয়। ভূগর্ভস্থ পানির এই লাগামহীন ব্যবহারে পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে গেছে; অনেক স্থানেই অগভীর নলকূপ অকার্যকর হয়ে গভীর নলকূপের মাধ্যমে বহু নিচ থেকে পানি উত্তোলন করতে হচ্ছে। শুধু তাই নয়, অতিরিক্ত আহরণের ফলস্বরূপ বাংলাদেশের বিশাল অঞ্চলের পানি ও মাটিতে আর্সেনিক দূষণের মাত্রাও ক্রমাগত বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে সেচের পানির অভাবে কৃষিকে এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেবে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন। সুতরাং, প্রেসিডেন্ট জিয়ার সেই খাল খনন কর্মসূিচ ছিল এদেশের কৃষকের জন্য যুগান্তকারী আশীর্বাদ, যার গুরুত্ব বর্তমান প্রেক্ষাপটে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। জিয়াউর রহমানের ‘১৯ দফা কর্মসূচি’-র একটি বড় অংশ ছিল কৃষি উন্নয়ন। তিনি দেশের কৃষি উৎপাদনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে উন্নতমানের বীজ ও সার কৃষকদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছিলেন। ভাল বীজ মানে ভাল ফসল- রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান একজন বিজ্ঞানীর মতই এ কথা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। তাই ১৯৭৭ সালের জুলাই মাসে বীজ অধ্যাদেশ প্রণয়নের মাধ্যমে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি হাতে নেন। বীজ অধ্যাদেশ এর মূল লক্ষ্য ছিল কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করে কিভাবে খাদ্য ঘাটতি ও দারিদ্র্য দূর করা যায়। তাই তিনি প্রথাগত চাষাবাদের পরিবর্তে আধুনিক ‘সবুজ বিপ্লব’ ত্বরান্বিত করতে উচ্চফলনশীল ইরি ও বোরো ধানের বীজের ব্যবহার দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেন। এই কর্মপ্রকল্পের ফলে কৃষকদের স্বল্প সময়ে অধিক ফসল ফলানোর স্বপ্ন দেখায়। একইসঙ্গে রাসায়নিক সারের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে তিনি ভর্তুকি মূল্যে সার বিতরণের ব্যবস্থা করেন এবং কৃষকরা যেন অর্থের অভাবে এসব উপকরণ কেনা থেকে বঞ্চিত না হয় সেজন্য কৃষি ঋণের প্রক্রিয়া অত্যন্ত সহজ ও গণমুখী করে তোলেন। তাঁর এই সময়োপযোগী ও মানবিক পদক্ষেপের ফলে সাধারণ কৃষকরা আধুনিক চাষাবাদে উৎসাহিত হয়, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রাণসঞ্চার করার পাশাপাশি দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে এক বিশাল ধাপ এগিয়ে নিয়ে যায়। জিয়াউর রহমান দেশের কৃষি ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন এবং সারা বছর ফসল উৎপাদনের লক্ষ্যে সেচ পাম্প বিতরণে কালজয়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তৎকালীন সময়ে বাংলাদেশের কৃষি ছিল মূলত বৃষ্টি-নির্ভর, ফলে শীতকালে সেচের অভাবে বিশাল পরিমাণ জমি অনাবাদি পড়ে থাকত। এই সংকট দূর করতে তিনি হাজার হাজার গভীর ও অগভীর নলকূপ এবং পাওয়ার পাম্প সাশ্রয়ী মূল্যে ও সহজ কিস্তিতে কৃষকদের মাঝে বিতরণের ব্যবস্থা করেন। তাঁর বিশেষ নির্দেশনায় গ্রাম পর্যায়ে সেচ কমিটি গঠন করা হয়, যাতে প্রান্তিক কৃষকরা সম্মিলিতভাবে পাম্প ব্যবহার করে তাদের জমিতে পানি সরবরাহ করতে পারে। কৃত্রিম সেচ ব্যবস্থার এই প্রসারের ফলে কৃষকরা কেবল বৃষ্টির ওপর নির্ভর না করে বছরে তিনবার ফসল ফলানোর সুযোগ পায়, যা দেশের কৃষি উৎপাদনে এক অভাবনীয় গতি সঞ্চার করে এবং গ্রামীণ কৃষকের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করে। কৃষিকে আধুনিকতার পথে চালিত করতে এবং উৎপাদন বৃদ্ধিতে কৃষকের দোরগোড়ায় উন্নত প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়ার অভূতপূর্ব লক্ষ্য নিয়ে প্রেসিডেন্ট জিয়া কৃষি সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করেন। তিনি শুধু কৃষি উপকরণের বিতরণ ব্যবস্থাকেই আমূল সংস্কার করেননি, এর ব্যবসাকে উদারীকরণের মাধ্যমে নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেন। যেখানে পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিএডিসি ও বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো রাসায়নিক সার, সেচ যন্ত্র (যেমন এলএলপি, স্যালো ও ডিপ টিউবওয়েল), এবং আধুনিক চাষ যন্ত্র (পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টর, রিপার, হার্ভেস্টার) বিতরণের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছিল, সেখানে জিয়া সরকারের দূরদর্শী নীতি বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করে সরবরাহ ব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটায়। এই পদক্ষেপের ফলে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষীরা সরাসরি আধুনিক প্রযুক্তির সুফল পেতে শুরু করে। এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের ফলে, মাত্র দুই বছরের মধ্যেই কৃষির আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি দেশের প্রতিটি প্রান্তে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফলে গ্রামীণ উৎপাদনশীলতায় সূচনা হয় এক নতুন অধ্যায়ের। জিয়াউর রহমান প্রান্তিক কৃষকদের মহাজনদের শোষণ ও চড়া সুদের কবল থেকে মুক্ত করতে কৃষি ঋণ ব্যবস্থাকে অত্যন্ত সহজ ও জনবান্ধব করে তুলেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, উপকরণের অভাবের চেয়েও মূলধনের অভাব কৃষকের বড় শত্রু তাই তিনি সরকারি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে বিশেষ করে ‘কৃষি ব্যাংক’-এর শাখা গ্রাম পর্যায়ে বিস্তৃত করেন। তাঁর নির্দেশনায় ‘বিশেষ কৃষি ঋণ কর্মসূচির চালু করা হয়, যার অধীনে কোনো জামানত ছাড়াই বা নামমাত্র শর্তে কৃষকদের সার, বীজ ও সেচ পাম্প কেনার জন্য ঋণ দেওয়া হতো। ঋণের এই বিকেন্দ্রীকরণের ফলে সাধারণ কৃষকরা প্রথমবারের মতো সরাসরি রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে আর্থিক সহায়তা পাওয়ার সুযোগ পায়। এতে তাদের উৎপাদন ক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন প্রাণচাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। মূলত এই মানবিক ঋণ সুবিধাই কৃষকদের ঋণের বোঝা থেকে মুক্তি দিয়ে আত্মনির্ভরশীল হতে সাহস জুগিয়েছিল। গ্রামীণ অবকাঠামোকে উন্নত করার লক্ষ্যে ১৯৭৭ সালের অক্টোবর মাসে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড প্রতিষ্ঠা করেন, যার দায়িত্ব ছিল গ্রাম অঞ্চলকে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসা। আর এই কর্মসূচির উদ্দেশ্য ছিল বিদ্যুৎ ব্যবহার করে সেচ সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্প্রসারণের মাধ্যমে আর্থসামাজিক উন্নয়ন বৃদ্ধি করা, যেন পল্লি এলাকার জনগণের জীবনমানের উন্নতি হয়। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং কৃষকদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জনে এক সুদূরপ্রসারী ও বহুমুখী কৌশল অবলম্বন করা হয়েছিল। এ নীতির অংশ হিসেবে তিনি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য খাদ্যের আপদকালীন মজুত গড়ে তোলার ওপর সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি, কৃষকদের শস্য উৎপাদনে উৎসাহিত করতে ন্যায্যমূল্যে সরাসরি ধান-চাল ক্রয়ের যে ব্যবস্থা তিনি গ্রহণ করেন, তা ১৯৮০-৮১ অর্থবছরে রেকর্ড পরিমাণ ১.০৩ মিলিয়ন টন চাল সংগ্রহে অবদান রাখে। এর ফলে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো চাল রপ্তানির গৌরব অর্জন করে। শস্য সংগ্রহের পর কৃষকদের কম দামে ফসল বিক্রি করে পরবর্তীকালে উচ্চমূল্যে তা ক্রয়ের প্রচলিত চক্র থেকে মুক্তি দিতে ১৯৭৮ সালে তিনি শস্য গুদাম ঋণ কর্মসূচি চালু করেন। এই যুগান্তকারী পদক্ষেপ কৃষকদের আর্থিক ক্ষতি থেকে রক্ষা করে তাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে এক কার্যকর সমাধান হিসেবে প্রমাণিত হয়। এভাবে, জিয়াউর রহমান তাঁর শাসনামলে দেশের খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা ও গ্রামীণ অর্থনীতির সুরক্ষায় এক বলিষ্ঠ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। জিয়াউর রহমান গতানুগতিক কৃষি ব্যবস্থাকে আধুনিকীকরণের মাধ্যমে দেশে ধান ও গমের উৎপাদনে অভ‚তপূর্ব সাফল্য এনেছিলেন। তিনিই পরনির্ভরশীল বাংলাদেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিয়েছিল। তিনি উচ্চফলনশীল ইরি ও বোরো ধানের পাশাপাশি গমের চাষকে দেশব্যাপী জনপ্রিয় করতে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেন, যার ফলে শীতকালীন অনাবাদি জমিগুলো সোনার ফসলে ভরে ওঠে এবং ১৯৮০-৮১ অর্থবছরে দেশ রেকর্ড পরিমাণ খাদ্যশস্য উৎপাদনে সক্ষম হয়। কেবল প্রধান দানাদার ফসলেই নয়, ডাল, তেলবীজ ও শীতকালীন শাকসবজির মতো ফসলের বৈচিত্র্য আনয়নে তিনি কৃষকদের উৎসাহিত করেছিলেন। এতে করে জনগণের পুষ্টির চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি কৃষকরা সারা বছর লাভজনকভাবে চাষাবাদ চালিয়ে যেতে পারে। তাঁর এই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার ফলে ফসল কাটার পর কৃষকদের অভাবের তাড়নায় কম দামে শস্য বিক্রির চক্র থেকে মুক্তি দিতে শস্য গুদাম ঋণ ও সরাসরি সরকারি সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হয়, যা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশকে প্রথমবারের মতো চাল রপ্তানির গৌরব এনে দেয়। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনকালে কৃষি খাতে স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যে বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান। গমের আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদন বৃদ্ধির সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়ে তিনি গম গবেষণার উপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। এই লক্ষ্যে ১৯৮০ সালের জুলাই মাসে দিনাজপুরের নশিপুরে প্রতিষ্ঠা লাভ করে গম গবেষণা কেন্দ্র। শুধু গম নয়, তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশের কৃষি গবেষণার এক বৃহৎ ও সমন্বিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে গাজীপুরে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এই স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানটি বহু ফসল নিয়ে গবেষণা, স্বতন্ত্র জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন, দেশের বিভিন্ন আবহাওয়া ও পরিবেশ উপযোগী জাত উন্নয়ন এবং কৃষক প্রশিক্ষণসহ বিবিধ গুরুত্বপূর্ণ ম্যানডেট নিয়ে যাত্রা শুরু করে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিশ্বাস করতেন যে, দেশের বিশাল কর্মক্ষম যুবশক্তিকে উন্নয়নের মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে না পারলে জাতীয় সমৃদ্ধি অসম্ভব। তাই তিনি যুব সমাজকে অলসতা ও হতাশা থেকে মুক্ত করে উৎপাদনমুখী কাজে লাগাতে ‘যুব উন্নয়ন মন্ত্রণালয়’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং দেশব্যাপী ব্যাপকভিত্তিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে হাজার হাজার শিক্ষিত ও অর্ধ-শিক্ষিত যুবক শহর ছেড়ে গ্রামে গিয়ে কৃষিকাজ, মৎস্য চাষ এবং হাঁস-মুরগি পালনে আত্মনিয়োগ করে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার করে। বিশেষ করে ‘খাল খনন কর্মসূচি’ ছিল যুবকদের দেশপ্রেম ও শ্রমের এক অনন্য পরীক্ষা, যেখানে কোদাল হাতে হাজারো তরুণ সরাসরি উন্নয়নের অংশীদার হয়ে প্রমাণ করেছিল যে, পরিশ্রমের মাধ্যমে দেশ পরিবর্তন করা সম্ভব। যুবকদের এই উৎপাদনশীল রূপান্তরের মাধ্যমেই তিনি সমাজ থেকে বেকারত্ব দূর করার পাশাপাশি কৃষিকে একটি মর্যাদাপূর্ণ পেশা হিসেবে নতুন প্রজন্মের কাছে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ছিলেন এমন একজন রাষ্ট্রনায়ক, যিনি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষের প্রোটোকল ভেঙে সরাসরি কৃষকের পলিমাখা মাঠ ও মেঠো পথে নিজের কর্মক্ষেত্র বেছে নিয়েছিলেন। তিনি তাঁর শাসনের অধিকাংশ সময় ব্যয় করেছেন দেশের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের খোঁজ নিতে। তিনি কেবল হেলিকপ্টারে আকাশপথে গ্রাম দেখেননি, পায়ে হেঁটে মাইলের পর মাইল দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে কৃষকের উঠোনে গিয়ে বসেছেন এবং তাদের সাথে একই থালায় খাবার খেয়ে সাধারণ মানুষের আপনজনে পরিণত হয়েছিলেন। তাঁর এই সরাসরি সম্পৃক্ততার সবচেয়ে বড় উদাহরণ ছিল খাল খনন কর্মসূচি, যেখানে তিনি নিজে কোদাল হাতে মাটি কেটে আমলাতন্ত্র ও সাধারণ মানুষের মধ্যে থাকা দেয়াল ভেঙে দিয়েছিলেন। জিয়াউর রহমানের এই মাটির কাছাকাছি থাকার রাজনীতি গ্রামীণ জনগণের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও দেশপ্রেমের নতুন জোয়ার সৃষ্টি করেছিল। পরিশেষে বলা যায়, আধুনিক কৃষির বিকাশ ও কৃষকের স্বার্থ সংরক্ষণে শহিদ জিয়াউর রহমানের ভূমিকা বাংলাদেশের ইতিহাসে স্মরণীয়। কৃষিকে স্বনির্ভরতার প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে তিনি যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন, তা পরবর্তী কৃষি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। মূলত, এদেশের পলিমাখা মাঠ আর ঘামঝরানো কৃষকের হৃদয়ে শহীদ জিয়া এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বেঁচে আছেন এবং তাঁর কৃষি দর্শনের সঠিক বাস্তবায়নই হতে পারে দেশের টেকসই খাদ্য নিরাপত্তার মূল চাবিকাঠি। লেখক ও গবেষক বাংলাদেশের ইতিহাসের এক ক্রান্তিলগ্নে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। লেখক ও গবেষক কৃষকদের প্রতি তাঁর এই অকৃত্রিম দরদ ও মাটির কাছাকাছি যাওয়ার মানসিকতা তাঁকে কেবল একজন রাষ্ট্রনায়ক নয়, সাধারণ মানুষের একজন আপনজনে পরিণত করেছিল। লেখক ও গবেষক কৃষকের ভাগ্যের এই পরিবর্তন তিনি ড্রয়িংরুমে বসে পরিকল্পনা করেননি, তিনি কোদাল হাতে কৃষকের সঙ্গে মিছিলে শামিল হয়ে প্রমাণ করেছিলেন যে, শ্রমের মর্যাদা কী। লেখক ও গবেষক মূলত তাঁর এই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও কৃষিবান্ধব নীতির মাধ্যমেই বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের স্বপ্ন দেখেছিল। লেখক ও গবেষক রাষ্ট্রপতি হিসেবে অভিষিক্ত হয়েই তিনি অগ্রাধিকার দিয়ে তাঁর গৃহীত পরিকল্পনা ও কর্মসূচিতে কৃষির আধুনিকায়ন ও উন্নয়নকে অন্তর্ভুক্ত করেন। লেখক ও গবেষক প্রেসিডেন্ট জিয়ার দূরদর্শী নেতৃত্বে দেড় বছরে সারা দেশে ১৫০০ এরও অধিক খাল খনন ও পুনঃখননের যে বৈপ্লবিক কর্মসূচি শুরু হয়েছিল, তা স্বল্প সময়ের মধ্যেই দেশকে খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিয়েছিল। লেখক ও গবেষক শুধু তাই নয়, অতিরিক্ত আহরণের ফলস্বরূপ বাংলাদেশের বিশাল অঞ্চলের পানি ও মাটিতে আর্সেনিক দূষণের মাত্রাও ক্রমাগত বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে সেচের পানির অভাবে কৃষিকে এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেবে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন। লেখক ও গবেষক জিয়াউর রহমানের ‘১৯ দফা কর্মসূচি’-র একটি বড় অংশ ছিল কৃষি উন্নয়ন।
পাঠকের মতামত 0
শালীন ও গঠনমূলক মন্তব্য কাম্যআপনার মন্তব্য লিখুন
আপনার ইমেইল ঠিকানাটি গোপন রাখা হবে। তারকা চিহ্নিত (*) ঘরগুলো পূরণ করা বাধ্যতামূলক।