বাংলা লাইভ নিউজ ডেস্ক: ১৯৭৫ সালের এই দিনে দেশের সিপাহি-জনতা ঐক্যবদ্ধভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে সকল চক্রান্ত রুখে দিয়েছিল। বাংলাদেশের ইতিহাসে ৭ নভেম্বর তাই এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

📌 এক নজরে মূল বিষয়:
  • •১৯৭৫ সালের এই দিনে দেশের সিপাহি-জনতা ঐক্যবদ্ধভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে সকল চক্রান্ত রুখে দিয়েছিল।
  • •বাংলাদেশের ইতিহাসে ৭ নভেম্বর তাই এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
  • •এটি শুধু একটি দিনের নাম নয়; এটি জাতির শত্রু-মিত্র চিহ্নিত করার, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার এবং গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের একটি প্রতীক।

এটি শুধু একটি দিনের নাম নয়; এটি জাতির শত্রু-মিত্র চিহ্নিত করার, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার এবং গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের একটি প্রতীক। বাংলাদেশের জন্ম, মুক্তিযুদ্ধ ও পরবর্তী রাজনৈতিক উত্থান-পতন নিয়ে আলোচনা করতে গেলে একটি প্রবাদবাক্য প্রণিধানযোগ্য: “অতীত নিয়ে সবসময় পড়ে থাকলে এক চোখ অন্ধ, অতীতকে ভুলে গেলে দু’চোখই অন্ধ।

” ইতিহাসকে অস্বীকার করা যায় না; আবার ইতিহাসের গণ্ডিতে আটকে থেকেও ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা যায় না। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের পথ রচনা করাই একটি জাতির পরিপক্বতার পরিচয়।

৭ নভেম্বর আমাদের সেই শিক্ষাই দেয়—স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষায় জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের পথ নির্ণয়ের একটি তারিখ।

যারা বাংলাদেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করে রাখতে চেয়েছিল, যারা জনগণের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার হরণ করে দেশে একদলীয় স্বৈরাচারী শাসন কায়েম করতে চেয়েছিল, যারা দেশের শৌর্য, বীর্য, সাহস ও সম্মানের প্রতীক সেনাবাহিনীর গৌরবকে ভূলুণ্ঠিত করতে চেয়েছিল—১৯৭৫ সালের এই দিনে দেশপ্রেমিক সিপাহি-জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লবের মাধ্যমে তাদের পরাজয় ঘটে। এই বিপ্লব প্রমাণ করে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে বিকিয়ে দেওয়ার বিষয় নয়; এটি লাখো শহীদের রক্ত ও কোটি মানুষের আকাঙ্ক্ষার ফসল।

১৯৭৫ সালের পটভূমি: চার দিনের অনিশ্চয়তা১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে চরম অস্থিরতা শুরু হয়। এরপর সেনা অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশ এক অনিশ্চিত পরিস্থিতির দিকে এগোতে থাকে।

৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর একটি উচ্চাভিলাষী অংশ সামরিক অভ্যুত্থান ঘটায়। তারা তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে ক্যান্টনমেন্টের বাসভবনে বন্দি করে।

এরপর বঙ্গভবনের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হয়, তৎকালীন প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাক আহমদকে গ্রেফতার করা হয়, মন্ত্রিসভা বিলুপ্ত ও জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। প্রধান বিচারপতি আবু সা’দাত মোহাম্মদ সায়েমকে রাষ্ট্রপতির পদে বসানো হয়।

জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর সর্বমহলে, বিশেষত সাধারণ সিপাহীদের কাছে ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয়। ৩ থেকে ৬ নভেম্বর মধ্যরাত পর্যন্ত দেশ এক শ্বাসরুদ্ধকর, অনিশ্চিত ও ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্যে থাকে।

কিন্তু ৬ নভেম্বর গভীর রাতে সেনাবাহিনীর সাধারণ সিপাহীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। সেই অভ্যুত্থানে স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন নিয়ে আপামর জনতা রাজপথে নেমে আসে।

সিপাহি-জনতার মিলিত সেই বিপ্লবে বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান। পরদিন ৭ নভেম্বর সর্বস্তরের সৈনিক ও জনতা সম্মিলিতভাবে ঢাকার রাস্তায় নেমে আসে; এই ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে।

অভূতপূর্ব এক সংহতির নজির সৃষ্টি হয়। ৬ নভেম্বর মধ্যরাতে ঘটে সিপাহি-জনতার ঐক্যবদ্ধ বিপ্লব, যা ইতিহাসে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে স্থান লাভ করে।

দেশবাসী সেদিন জিয়াউর রহমানের হাতেই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব তুলে দেয়। তদানীন্তন দৈনিক বাংলার ৭ নভেম্বরের রিপোর্টে বলা হয়, “সিপাহি ও জনতার মিলিত বিপ্লবে চারদিনের দুঃস্বপ্ন শেষ হয়েছে।

মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার রাত প্রায় ১টায় সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, নৌবাহিনীর সিপাহি-জওয়ানরা বিপ্লবী অভ্যুত্থান ঘটিয়েছেন।

ষড়যন্ত্রের নাগপাশ ছিন্ন করে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে উদ্ধার করেছেন বিপ্লবী সিপাহীরা। ” ৭ নভেম্বর ভোরে রেডিওতে ভেসে আসে, “আমি মেজর জেনারেল জিয়া বলছি।

” জেনারেল জিয়া জাতির উদ্দেশে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে যথাস্থানে নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের জন্য সবার প্রতি আহ্বান তুলে ধরেন। সেদিন রাজধানী ঢাকা ছিল মিছিলের নগরী।

পথে পথে সিপাহি-জনতা একে অপরকে আলিঙ্গন করেছে। “নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবর”, “বাংলাদেশ জিন্দাবাদ” ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়ে ওঠে।

আনন্দে উদ্বেলিত হাজার হাজার মানুষ রাজপথে নেমে আসে। সাধারণ মানুষ ট্যাঙ্কের নলে ফুলের মালা পরিয়ে দেয়। এই আনন্দের ঢেউ রাজধানী ছাড়িয়ে দেশের সব শহর-নগর-গ্রামে পৌঁছে যায়।

খ্যাতিসম্পন্ন সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তার ‘বাংলাদেশ: এ লিগ্যাসি অব ব্লাড’ বইতে ৭ নভেম্বর সম্পর্কে লিখেছেন, ১৯৭৫ সালের ৫ ও ৬ নভেম্বর ক্যান্টনমেন্টসহ সারা শহরে হাজার হাজার প্রচারপত্র ছড়ানো হয়। একটি ব্যাপারে ডান ও বাম উভয় রাজনৈতিক দলই একমত ছিল—খালেদ মোশাররফ একজন বিশ্বাসঘাতক, ভারতের দালাল এবং সে ঘৃণিত বাকশাল ও মুজিববাদ ফিরিয়ে আনতে চাইছে।

৭ নভেম্বর ভোরের দিকে জওয়ানরা ব্যারাক থেকে বেরিয়ে পড়ে। সারা ঢাকা শহরে এই ‘সিপাহি বিপ্লব’ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। রাত ১টার মধ্যেই সিপাহীরা পুরো ক্যান্টনমেন্ট দখল করে নেয়।

একদল জওয়ান যায় জেনারেল জিয়ার বাসভবনে। চার দিন বন্দি থাকার পর মুক্তি পান জেনারেল জিয়া। নৈশ পোশাক পরা অবস্থাতেই উল্লসিত জওয়ানরা তাকে কাঁধে করে নিয়ে যায় ২ ফিল্ড আর্টিলারির হেডকোয়ার্টারে।

ঘটনার আকস্মিকতায় জিয়া তখন বিহ্বল। মাসকারেনহাস আরও লিখেছেন, রেডিওতে ক্রমাগত সিপাহি-জনতার বিপ্লবের ঘোষণা এবং জেনারেল জিয়ার ক্ষমতা গ্রহণের খবর শুনে হাজার হাজার লোক স্রোতের মতো রাস্তায় নেমে আসে।

তিন দিন ধরে তারা বিশ্বাস করছিল, ভারত খালেদ মোশাররফের মাধ্যমে তাদের কষ্টে অর্জিত স্বাধীনতাকে বিপন্ন করছে। এখন সেই দুঃস্বপ্ন কেটে গেছে।

সারারাত তারা স্লোগান দেয়—“আল্লাহু আকবর, বাংলাদেশ জিন্দাবাদ, সিপাহি বিপ্লব জিন্দাবাদ। ” অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল, ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের মতো এদেশের মানুষ আবার জেগে উঠেছে।

এটি ছিল একটি স্মরণীয় রাত।

[সম্পাদকীয় নোট: বাংলা লাইভ নিউজ বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদন পরিবেশন করে। যেকোনো নতুন তথ্য প্রাপ্তিসাপেক্ষে প্রতিবেদনটি নিয়মিত হালনাগাদ হতে পারে।]