দেশে আগামী ১৬ ডিসেম্বর থেকে ন্যাশনাল ইক্যুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) সিস্টেম কার্যকর হওয়ার প্রেক্ষাপটে মজুদ ও পাইপলাইনে থাকা অননুমোদিত মোবাইল ফোন বিক্রি নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। বুধবার (১০ ডিসেম্বর) সচিবালয়ে হ্যান্ডসেট উৎপাদক, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) ও মোবাইল ব্যবসায়ীদের মধ্যে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অননুমোদিত ফোন বিক্রির জন্য বিক্রেতারা মার্চ মাস পর্যন্ত সময় পাবেন। বৈঠক শেষে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন মোবাইল বিজনেস কমিউনিটি বাংলাদেশের সভাপতি মো. আসলাম। তিনি জানান, বৃহস্পতিবার (১১ ডিসেম্বর) সরকার এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেবে।

এদিকে, মোবাইল ফোন আমদানি ও ভেন্ডর লাইসেন্স তালিকাভুক্তিকরণ সহযোগিতার বিষয়ে বিটিআরসি ও মোবাইল বিজনেস কমিউনিটি বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মঙ্গলবার (৯ ডিসেম্বর) সকাল সাড়ে ১১টার দিকে বিটিআরসি ভবনে আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় মোবাইল হ্যান্ডসেট আমদানি এবং ভেন্ডর এনলিস্টমেন্ট সনদ প্রদানের বিদ্যমান প্রক্রিয়া সহজীকরণের উপায় নিয়ে বিশদ আলোচনার পর নিম্নোক্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

প্রথমত, ন্যূনতম কাগজপত্র দাখিলের মাধ্যমে স্বল্প সময়ের মধ্যে ভেন্ডর এনলিষ্টমেন্ট সনদ প্রদান এবং বিদেশ থেকে ক্লোন, কপি, ব্যবহৃত বা রিফারবিসড মোবাইল হ্যান্ডসেট বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অনুপ্রবেশ রোধকল্পে শুধু মোবাইল ফোনের মূল উৎপাদনকারী সংস্থার পাশাপাশি যেকোনো অনুমোদিত সরবরাহকারীর প্রত্যায়নপত্রসহ (চুক্তির পরিবর্তে) আবেদন করা হলে বিটিআরসি থেকে সহজেই তাদের অনুকূলে আমদানির অনুমোদন প্রদান করা হবে।

দ্বিতীয়ত, একই সঙ্গে ক্লোন, কপি, ব্যবহৃত বা রিফারবিসড মোবাইল হ্যান্ডসেট বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অনুপ্রবেশরোধের বিষয়টি নিশ্চিত করে আমদানি প্রক্রিয়া কীভাবে আরো সহজ করা যায় সে বিষয়ে সুস্পষ্ট লিখিত প্রস্তাব প্রদানের জন্য বিটিআরসি’র পক্ষ থেকে ‘মোবাইল বিজনেস কমিউনিটি বাংলাদেশ’ এর প্রতিনিধিগণকে আহ্বান জানানো হয়।

তৃতীয়ত, ‘মোবাইল বিজনেস কমিউনিটি বাংলাদেশ’ এর চাহিদার প্রেক্ষিতে আগামী ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের বাজারে বিদ্যমান অবিক্রিত সব মোবাইল হ্যান্ডসেট নিয়মিতকরণের উদ্দেশ্যে এ সংশ্লিষ্ট তথ্য নির্ধারিত ছকে জমা প্রদান করলে বিটিআরসি থেকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

সর্বোপরি, ‘বেতার যন্ত্রপাতি ব্যবহার, বাজারজাতকরণ ও তালিকা গ্রহণের নির্দেশিকা, ২০২৪’ অনুযায়ী বৈধভাবে মোবাইল ফোন আমদানি করা হলে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে বিটিআরসি থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে মর্মে আশ্বস্ত করা হয়।

অন্যদিকে, বৈধভাবে মোবাইল ফোন আমদানির শুল্কহার কমাতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এবং বিটিআরসির মধ্যকার সভায় গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গত ১ ডিসেম্বর সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এ সভায় যেসব প্রবাসীর জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) রেজিস্ট্রেশন কার্ড আছে, তারা ট্যাক্স ছাড়া মোট তিনটি ফোন সঙ্গে আনতে পারবেন বলে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশে ক্লোন মোবাইল, চুরি বা ছিনতাই করা ফোন এবং রিফারবিশড মোবাইল আমদানি বন্ধ করা হবে।

সভার সিদ্ধান্তসমূহ অনুযায়ী, প্রবাসীরা দেশে ছুটি কাটানোর সময়ে ৬০ দিন পর্যন্ত স্মার্টফোন রেজিস্ট্রেশন ছাড়াই ব্যবহার করতে পারবেন। ৬০ দিনের বেশি থাকলেই মোবাইল ফোন রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। প্রবাসীদের যাদের বিএমইটি রেজিস্ট্রেশন কার্ড আছে, তারা ফ্রিতে মোট তিনটি ফোন সঙ্গে আনতে পারবেন। চতুর্থ ফোনের ক্ষেত্রে ট্যাক্স দিতে হবে। যাদের বিএমইটি কার্ড নেই তারা নিজের ব্যবহারের ফোনের পাশাপাশি অতিরিক্ত একটি ফোন ফ্রিতে আনতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে মোবাইল ক্রয়ের বৈধ কাগজটি নিজের সঙ্গে রাখতে হবে।

এছাড়া, স্মার্টফোনের বৈধ আমদানি শুল্ক উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনা হবে। এতে বৈধভাবে আমদানি করা মোবাইল ফোনের দাম কমে আসবে। বর্তমানে বৈধ পথে মোবাইল আমদানির শুল্ক প্রায় ৬১ শতাংশ। আমদানি শুল্ক কমালেই বাংলাদেশের ১৩-১৪টি ফ্যাক্টরিতে উৎপাদনকৃত মোবাইলের শুল্ক ও ভ্যাট কমাতে হবে, অন্যথায় কম্পানিগুলোর বিদেশি বিনিয়োগ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে।

এদিকে, দেশীয় প্রযুক্তির সক্ষমতা এবার যেন নতুনভাবে চিনছে বাংলাদেশ। জুম, গুগল মিট বা মাইক্রোসফট টিমস নয়—সম্পূর্ণ দেশীয় অ্যাপ ‘কনভে’-তে সফলভাবে অনুষ্ঠিত হলো বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) ষষ্ঠ বার্ষিক জাতীয় গণশুনানি। এটি প্রথমবারের মতো পুরোপুরি অনলাইনভিত্তিক গণশুনানি আয়োজন।

এর আগে কনভে প্ল্যাটফর্মে দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত জি২০-এর সিডসসা ২০২৫-এর সরকারি ভার্চুয়াল সভা, পরিবেশ, বন, জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় ও পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জাতীয় প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, আফ্রিমাসের অনলাইন ট্রেনিং এবং জাতীয় জলবায়ু অর্থায়ন সম্মেলনসহ বহু দেশীয়-আন্তর্জাতিক কর্মসূচি সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

রাজধানীর বিটিআরসি ভবন থেকে পরিচালিত সাম্প্রতিক গণশুনানিতে কনভের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে অসংখ্য মানুষ যুক্ত হন। তারা মোবাইল নেটওয়ার্কের মান, কলড্রপ, ইন্টারনেটের গতি-স্থিতিশীলতা, ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিস, অবাঞ্ছিত প্রচারণামূলক এসএমএস, ডেটার মূল্য, গ্রাহকসেবা ও গ্রামীণ-শহুরে নেটওয়ার্ক বৈষম্যসহ নানা অভিযোগ ও মতামত তুলে ধরেন। সংশ্লিষ্ট সদস্যরা তাৎক্ষণিকভাবে প্রশ্নের জবাব দেন এবং সব মন্তব্য ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণে সংরক্ষণ করা হয়। গণশুনানিতে সভাপতিত্ব করেন বিটিআরসির ভাইস চেয়ারম্যান মো. আবু বকর ছিদ্দিক।

অনুষ্ঠান শুরুর ৩০ মিনিট আগে কনভের লিংক উন্মুক্ত করা হয়, নিবন্ধন করলেই কেউ সহজে সেশনে যোগ দিতে পারেন। এতে রাজধানীমুখী আয়োজন ভেঙে সারাদেশের মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়। আয়োজক ও অংশগ্রহণকারীরা জানান, পুরো সেশনজুড়ে কনভের অডিও–ভিডিও সংযোগ ছিল অত্যন্ত স্থিতিশীল। স্পিকার নির্বাচন, কিউ ম্যানেজমেন্ট, মাইক্রোফোন নিয়ন্ত্রণ, সময় ব্যবস্থাপনা, স্ক্রিন শেয়ারিং ও রেকর্ডিং সবকিছু একই প্ল্যাটফর্মে নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়।

দেশীয় প্রতিষ্ঠান সিনেসিস আইটি পিএলসি উদ্ভাবিত ‘কনভে’ একটি সম্পূর্ণ সার্বভৌম ভিডিও কনফারেন্সিং প্ল্যাটফর্ম। অডিও–ভিডিও, চ্যাট, লগ ও রেকর্ডিংসহ সব ডেটা দেশের নিরাপদ অবকাঠামোয় সংরক্ষণ করা হয়। এতে রয়েছে এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন, মাল্টিফ্যাক্টর অথেনটিকেশন, ভূমিকাভিত্তিক অ্যাকসেস কন্ট্রোল এবং একই সময়ে কয়েক হাজার অংশগ্রহণকারী যুক্ত রাখার সক্ষমতা। বুয়েটসহ শীর্ষ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণদের তৈরি কনভে কেবল ভিডিও কনফারেন্সিং টুল নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ, নিরাপদ ও স্কেলেবল অফিস কোলাবোরেশন সল্যুশন। প্রযুক্তিবিদদের মতে, কনভের সক্ষমতা আন্তর্জাতিক মানের—যা জুম ও গুগল মিটের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠার মতো শক্তিশালী। ইতোমধ্যে আফ্রিকা, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন কর্মসূচিতে ব্যবহৃত হচ্ছে প্ল্যাটফর্মটি। দেশীয় উদ্ভাবনের এই সাফল্য বড় সরকারি সভা, নীতিসংলাপ ও জনপরামর্শকে আরও নিরাপদ, স্বচ্ছ এবং জনগণের অংশগ্রহণ–নির্ভর এক নতুন মানদণ্ডে নিয়ে এসেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *